এই ক'দিনে করোনা আর লকডাউনের পাশাপাশি যে শব্দটা সবথেকে বেশি চর্চিত হয়েছে সমাজজুড়ে সে'টা বোধ হয় "পরিযায়ী" শ্রমিক। যদিও আজকের দুনিয়ায় মেহনতি জনতার এই বিশেষ বর্গটির "পরিযায়ী" নামকরণ নিয়ে বিবিধ বিতর্ক আছে, তবুও নামকরণের বিতর্ক এড়িয়ে এখানে আমরা প্রচলিত এই শব্দবন্ধটিই ব্যবহার করছি। এ'কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে আপাতভাবে অদৃশ্য এই বিশাল সংখ্যক জনগণকে আমরা যেই নামেই ডাকি না কেন তার অস্ত্বিত্বের কথা আজ এসে পৌঁছেছে মধ্যবিত্তের ড্রয়িং রুমের একদম ভেতরে। ঠিক আড়াইমাস আগেও যারা ছিলেন না-থাকারই দলে, এখন তারা ছাপার অক্ষরে, টিভির পর্দায়, ফেসবুকের টাইমলাইনে সর্বত্রই দৃশ্যমান। তাদের অসহায়তা, করুণ আর্তি, না-খেতে পাওয়া চোখের চাউনি, ট্রেনে কাটা পড়া নিঃস্পন্দ দেহ এবং সর্বশেষ মুজাফফরপুর স্টেশনের সেই মৃত মা ও তার গায়ের চাদর ধরে টানা শিশুর ভয়াবহ দৃশ্যর মধ্য দিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকরা আজ উপস্থিত আমাদের চেতনার সামনে। এই মানুষগুলো কি খুব দূরের কেউ যাদের শুধু সংবাদ বা সামাজিক মাধ্যমেই দেখা যায়? খোঁজ নিলে দেখবো আমাদেরই শহুরে পাড়ার সেই পলিটেকনিক বা নার্সিং পড়া ছেলেটা বা মেয়েটা, মফঃস্বলের স্কুলের বন্ধু বা গ্রামবাংলার একগুচ্ছ পড়শি তারাই ফি-বছর সুদূরে কাজ করতে যায়। কেউ তামিলনাড়ুতে ইমারত গড়ে, কেউ বা গুজরাটে কাপড় বোনে, দিল্লিতে এমব্রয়ডারির কাজ করে, মহারাষ্ট্রে কোনও এক কারখানায় সুপারভাইজার বা ঠিকা শ্রমিক, অথবা ব্যাঙ্গালোরের সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে নার্সের কাজ করে। আজ তাহলে কোন বিশেষ কারণে ভিনজায়গায় কাজ করতে যাওয়া এই বিশাল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের সংকটের ছবি একইরকম লক্ষণীয়ভাবে ধরা দিল চোখের সামনে? আসলে তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে এটা কোনও আকস্মিক ঘটনার বহিঃপ্রকাশ নয়। লকডাউন আমাদের চোখের সামনে একটা গভীরতর সংকটের কয়েক ঝলক দেখিয়ে গেল - "অদৃশ্য"কে দৃশ্যমান করে দিয়ে গেল ক্ষণিকের জন্য হলেও।

কিছু অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। আমরা মাইগ্রান্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে লকডাউনের একদম গোড়াতে ৬টি ভাষায় ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু করি। বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে গিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের গ্রুপের নাম নথিভুক্ত করার জন্য। প্রথম দফার লকডাউনে মূলত খাদ্য, বাসস্থান ও মজুরী জনিত সমস্যা নিয়ে শ্রমিকরা যোগাযোগ করেন। আমরা প্রতিটা ক্ষেত্রেই প্রাথমিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করি সমস্যা সমাধানের জন্য কারণ সরকারী নির্দেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রেরই কর্তব্য ছিল সেগুলো সমাধান করা। কিন্তু বাস্তবে দেখি ঠিক তার উল্টো ছবি। কোনও একটি রাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য যথাযথ রেশন, উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা বা মজুরী সংক্রান্ত প্রশ্নে তদারকি করার জন্য সেই রাজ্যটির কাছে শ্রমিকদের যে তথ্য থাকতে হয় তার ন্যুনতমটুকুও নেই তাদের কাছে। ফলত লকডাউনকালে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ব্যবস্থাপনার সরকারী ঘোষণাগুলো আসলে উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে নেহাতই ফাঁকা বুলিতে পর্যবসিত হয়। 

আমাদের মতো বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন মারফত খবর পেয়ে প্রশাসন বড়োজোর কিছু জায়গায় এককালীন "ত্রাণ" পৌঁছেছে আর সরকারী ব্যবস্থাপনায় কমিউনিটি কিচেন চলেছে নানা জায়গায়। প্রায় কোথাওই কোনও নিয়মমাফিক রেশনের ব্যবস্থা হয়নি। কমিউনিটি কিচেনগুলোর খাবারের পরিমান বা গুণমানের যা খবর পেয়েছি তা দিনের পর দিন খাওয়া মানুষের পক্ষে অসাধ্য। অগত্যা সরকারী ব্যবস্থাপনার এই করুণ দশার কারণে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগগুলোর ওপরই দায়িত্ব বর্তায় পরিযায়ী শ্রমিকদের আপদকালীন রিলিফ পৌঁছে দেওয়ার। 

এরপর লকডাউনের দ্বিতীয় দফা থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে-ফেরানোর বিষয়টি নিয়ে সরব হতে থাকেন শ্রমিকরা নিজেই। তাদের সাথে একই সুরে এই প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারকে স্পষ্ট নীতি ঘোষণা করার দাবীতে চাপ দেওয়া হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে। অবশেষে দীর্ঘ টালবাহানার পর জটিল পাটিগাণিতিক হিসাব দেখিয়ে রেল মন্ত্রক "শ্রমিক স্পেশাল" ট্রেনের ঘোষণা করে - যাতে অতিরিক্ত মূল্য সহকারে ট্রেনের সম্পূর্ণ ভাড়া শ্রমিকদের অথবা রাজ্য সরকারগুলোর কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজ্যে আটকে থাকা শ্রমিকদের নাম নথিভুক্তিকরণের জন্য অনলাইন পোর্টালও চালু করা হয় যার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। এছাড়া আছে স্পেশাল ট্রেনের যাত্রীলিস্টে নাম তোলার জন্য স্থানীয়ভাবে পুলিস-প্রশাসনের ঘুষ-দুর্নীতির চিরন্তন গল্প। এসবের চক্করে পড়ে বহু শ্রমিক বাধ্য হয়েই পায়ে হাঁটা লাগিয়েছেন জীবন বাজি রেখে, যে ছবি আমরা প্রথম থেকেই দেখছি। অনেকে সাইকেলে করে পারি দিয়েছেন কয়েক হাজার মাইল যাত্রাপথ বা জীবনভর খেটে-খেয়ে পরিবারের জন্য অর্জিত সামান্য সঞ্চয়ের বিনিময়ে জায়গা করে নিয়েছেন বাড়ি ফেরার বাসে বা ট্রাকে গাদাগাদি করে। কর্পোরেট লবির স্বার্থে শ্রমিকদের ঘরে-ফেরানোর প্রক্রিয়ায় আরো গড়িমসি করা শুরু হয়। 

এতকিছু করে শেষমেশ "শ্রমিক স্পেশাল" ট্রেনে যাদের ঠাঁই হচ্ছে, তাদেরও কী অবস্থা হচ্ছে আমরা দেখতেই পাচ্ছি। অনির্দিষ্টকালের যাত্রাপথে একবেলা অল্প একটু খাবার, পানীয় জলের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা এই সব মিলিয়ে হয় অসুস্থ হয়ে অথবা আধমরা হয়ে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরছেন। শ্রমিক স্পেশাল ট্রেনে ১৯ দিনে ৮০ জনের মৃত্যুর খবর ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে এসে পৌঁছেছে। নিজের ঠিকানায় ফেরার পরও বেশিরভাগ জায়গাতেই স্ক্রিনিং টেস্ট, কোয়ারেন্টাইনের  ব্যবস্থা না থাকায় এবং স্থানীয় মানুষের অসহযোগিতার কারণে আরো একদফা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। 

এই সব কিছুর মধ্যেও আশাব্যঞ্জক ব্যাপার হল সংবাদ মাধ্যমে পরিযায়ী শ্রমিকদের যে অসহায়তার ছবি আমরা দেখছি প্রতিনিয়ত, তার বাইরে অন্য একটা বাস্তবতাও আছে। লকডাউনের শুরু থেকে রেশন, বাসস্থান, মজুরির দাবীতে, পুলিস ও মালিকী জুলুমের প্রতিবাদে ১৭০-র ওপর শ্রমিক বিক্ষোভের খবর পেয়েছি আমরা দেশজুড়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকর্তৃক অন্যায় অব্যবস্থা যে অসহায়ভাবে মুখ বুজে শ্রমিকরা মেনে নিচ্ছেন তা নয়, সাধ্যমতো সোচ্চারও হচ্ছেন নিজেদের ন্যায্য দাবীতে। আরেকটা বিষয় উল্লেখযোগ্য। আমরা দেখলাম পুরো পরিস্থিতি সামলাতে রাষ্ট্র শুধুমাত্র প্রশাসনিক আমলাদের উপরই নির্ভর করলো। জনগণের এতোবড়ো সংকট মোকাবিলা করতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কার্যত কোনও ভূমিকাই দেখা গেল না। বিশ্বের "সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র"র দেশে এর চেয়ে প্রহসন আর কিই বা হতে পারে!

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গোড়া থেকেই পেটের টানে বা অন্য নানা বাধ্যবাধকতার কারণে মানুষের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কাজ করতে যাওয়া চালু ব্যাপার ছিল। কিন্তু বিগত তিনদশকের বেশি সময় ধরে সারা বিশ্ব তথা আমাদের দেশে শ্রম প্রক্রিয়ার যে ব্যাপক রদবদল হয়েছে আর্থিক (নয়া-)উদারীকরণের হাত ধরে, তার ফলে শ্রমের পরিগমণের চরিত্রের বেশ বড়সড় একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে। বেশিরভাগ কাজের চরিত্র হয়েছে "ইনফর্মাল" অর্থাৎ আইনি ভাবে একজন কারখানার শ্রমিকের যে সুরক্ষাগুলো প্রাপ্য, সেগুলোর একাধিক বা সবকটা থেকেই এরা বঞ্চিত। সামাজিক সুরক্ষার ছিটেফোঁটাও শ্রম দপ্তরের খাতা পেরিয়ে এদের কাছ অব্দি পৌঁছায় না। কাজের অস্থায়ী চরিত্রের কারণেই পরিযায়ী শ্রমিকদের গন্তব্যগুলোও পরিবর্তনশীল। যেখানে তারা কাজ করতে যান সেখানকার সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনেও এদের কোনও প্রভাব নেই। অর্থাৎ এই পরিযায়ী শ্রমিকদের চরিত্র যেন অনেকটাই "ভাসমান" প্রকৃতির। পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে ১৯৭৯ সালের যে আইনটি আছে তার মাধ্যমে এর বড়ো অংশ ইনফর্মাল শ্রমিকরা কোনওরকম লাভবান হন না। আন্তঃরাজ্য ও অন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রকৃত সংখ্যার কোনও হিসাব নেই সরকারগুলোর কাছে। এদিকে আবার শ্রম-আইন সংস্কারের নামে শ্রমিকদের বহু লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্জিত আইনি অধিকারগুলোও তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আর একদিকে পড়ে আছে জন্মলগ্ন থেকেই আইনিভাবে অসুরক্ষিত, অস্বীকৃত এক বিরাট শ্রমবাহিনী। সব মিলিয়ে এরকম এক কঠিন পরিস্থিতিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সংগঠিত লড়াই-আন্দোলন গড়ে তোলা সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশে শ্রমিকদের অধিকার-আন্দোলনকে নতুনভাবে রূপ দিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে আগামীদিনে।

সৌম্য চট্টোপাধ্যায়, মাইগ্রান্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি নেটওয়ার্ক এর সাথে যুক্ত আন্দোলনের কর্মী। 

এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় উত্তরবঙ্গ সংবাদে। লেখকের অনুমতি নিয়ে এখানে পুনঃপ্রকাশিত হল।